কৃষ্ণপক্ষের জোছনা – মিসির আলি

কৃষ্ণপক্ষের জোছনা – মিসির আলি
November 12, 2019 No Comments Fictions, Novel, উপন্যাস, গল্প, মিসির আলি ismithpasha

এক

টিক টিক টিক টিক টিক . . . . ঘড়ির টিক টিক শব্দটা এখন মিসির আলির কাছে অসহ্য মনে হচ্ছে। শব্দের কারনে মাথা ব্যাথাটা ক্রমাগত বেড়ে চলছে। মস্তিষ্কের সমস্ত স্নায়ু যেন কেবল এই টিক টিক শব্দের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে ডান দিকের ঘড়িটির দিকে তাকাল মিসির আলি। বিশাল আকারের এক দেয়াল ঘড়ি। ইদানিং সবখানেই ডিজিটাল ঘড়ি চলে। অবশ্য এনালগ এই ঘড়ির বয়সও নেহায়েত ৫-৬ বছরের কম হবে না। গোলাকার ঘড়িটির চারপাশে কিছু কিছু স্থান বিবর্ন হয়ে গেছে। ঘড়িতে দুপুর বারটা পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি বাজে। ঘড়ির সময় ঠিক আছে তো! হাত ঘড়ির দিকে তাকাল মিসির আলি। সর্বনাস ! ঘড়ি কোথায় গেল! চিন্তা করবেন না আপনার ঘড়ি ঠিক আছে। পাশের বেডের যুবক ছেলেটা বলল।

– আপনি যখন অজ্ঞান ছিলেন তখন অপারেশনের সময় আপনার হাত থেকে ডাক্তার ঘড়ি খুলে রেখেছিল। বড্ড বাঁচা বেঁচে গেছেন। আর একটু হলেই রাস্তার পাশের লোহার শিকে মাথাটা গেথে যেত।

মনে করার চেষ্টা করল মিসির আলি। যতদূর মনে আছে ফার্মগেট থেকে খামারবাড়ির দিকে হেটে আসার সময় হঠাত এক মোটরসাইকেল ফুটপাতে উঠে এসে তাকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার কারনে সে পাশের দেয়ালে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তারপর আর কিছু মনে নেই। এখন দেখে হাসপাতালের বেডে পড়ে আছে। পাশের বেডের ছেলেটার পায়ে প্লাস্টার করা, সম্ভবত পা ভেঙ্গে গেছে।

– আপনি কে ?

– আমিই সেই ব্যাক্তি যার কারনে আপনি এইখানে। আসলে নতুন বাইক চালানো শিখেছি তো। তাই উত্তেজনার চোটে ফাঁকা রাস্তা পেয়ে একটু জোরে টান দিতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু সামনে একটা ইটের উপর চাকা উঠে গেল। তারপর কিভাবে যে ফুটপাতে উঠে আপনার উপর লাগল কিছুই বুঝতে পারলাম না।

– ও আচ্ছা।

– আমি খুবই দুঃখিত, আমার কারনে এমন হবে আমি বুঝতে পারিনি। পণ করেছি বাইক চালানোই ছেড়ে দিব।

– ছাড়ার কি দরকার ! এই জ্যামের শহরে মোটরসাইকেল বেশ কাজের জিনিস।

– নাহ, বাইক চালাব না। হিমু ভাইয়ের মত হেটেই চলাফেরা করব। অবশ্য একটা সাধারন সাইকেলও কেনা যেতে পারে।

– এই হিমু ভাইটা কে? নামটা বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে!

– হিমু ভাই আমার কাজিন। অতি চমৎকার মানুষ। সবসময় হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে থাকে। তার মধ্যে অনেক আধ্যাতিক ক্ষমতা আছে। সে মানুষের ভবিষ্যতও বলতে পারে।

– তাই নাকি। তা কি ধরনের ভবিষ্যত বলতে পারে ?

– এই যে আজকের এই দূর্ঘটনাও তার একরকম ভবিষ্যৎ বানী ছিল। আমি তাকে বাইক কেনার কথা বলতে সে আমাকে যান্ত্রিকতার উপর নির্ভর হতে বারন করে। তার মতে ঢাকা শহর নাকি পায়ে হাটার আর রিক্সার শহর। আজ দেখুন, বাইক চালাবার প্রথম দিনেই দুর্ঘটনা।

– মোটরসাইকেল চালাবার প্রথমদিনে দূর্ঘটনা ঘটাটা খুবই স্বাভাবিক একটা জিনিস। এতে ভবিষ্যত বানীর কিছু নেই। আপনার হিমু ভাই কি বলেছেন যে মোটরসাইকেল কেনার প্রথম দিনেই দূর্ঘটনা ঘটবে?

– না, তা বলেনি। তবে বাইক কেনার কথা বলতেই যান্ত্রিকতা থেকে দূরে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছিল। যন্ত্রের উপর নিজের নির্ভরশীলতা যত কম রাখা সম্ভব হয় তত কম রাখতে বলেছিল। সেইটাই বা কম কিসের।

এমন সময় কর্তব্যরত ডাক্তার আসলেন। মিসির আলিকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। বাহ আপনার ঘুম ভাঙল তাহলে। শুরুতে আপনাকে নিয়ে একটু ভয়ই পেয়ে গেছিলাম। কিন্তু আসলে গুরুতর কিছুই হয় নি। মাথার আঘাতের কারনে সর্বোচ্চ সাপ্তাহখানেক মাথা ব্যাথায় ভুগতে পারেন। আপনাকে কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি তা নিয়মিত সেবন করবেন। আর আজ ৫ টার পরই আপনি বাসায় যেতে পারবেন। আপনার মানিব্যাগ এবং ঘড়ি কিছুক্ষনের মাঝেই আপনাকে দিয়ে দেওয়া হবে। আর আপনার চশমাটা ভেঙ্গে গেছে। সেটা আপনাকে একটা নতুনই কিনতে হবে।

ডাক্তার যেতে না যেতেই এক ভদ্র মহিলা হাউ মাউ করে কান্না করতে করতে পাশের ছেলেটার কাছে ছুটে আসল। মিসির আলি লক্ষ করলেন মহিলা এই মুহুর্তে কান্না-কাটিতে ভেঙ্গে পড়লেও হাসপাতালে বেশ সেজে-গুজেই এসেছেন। হাতে কিসের যেন একটা কার্ড। সম্ভবত বিয়ে বা এইরকমই কোন অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। মহিলার পেছনে পেছনে যে বয়স্ক লোকটি এসেছেন সে সম্ভবত ছেলেটির বাবা। বেশ বিরক্তির চোখে চারদিকে তাকাচ্ছেন। তার ছেলে এইরকম একটা সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ডে পড়ে আছে সেইটা দেখে তিনি হয়ত হজম করতে পারছেন না। মিসির আলির ধারনা কিছুক্ষনের মধ্যে লোকটি তার ছেলের জন্য একটা ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করে ফেলবেন। হঠাত ভদ্র মহিলা লোকটিকে দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন।

– কি ব্যাপার! আমার ছেলের এই অবস্থা দেখে তোমার তো মনে হয় খুশিই হচ্ছে। ছেলেটা কত কষ্টে আছে। সারাদিন তো একটা দানা পানিও মুখে জুটেছে বলে মনে হচ্ছে না। আর তুমি কিছু না করে ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়েই আছ। যাও ছেলের জন্য এখনি খাবার নিয়ে আস।

– আচ্ছা যাচ্ছি! বেশ বিব্রতভাবে জবাব দিলেন লোকটি।

– দাড়াও! কি আনবে না শোনে যাচ্ছ কোথায়! কিরে বাদল, কি খাবি তুই। কাচ্চি নিয়ে আসতে বলব তোর বাবাকে। আজকে তো বিয়েতে কাচ্চিই খাবার কথা ছিল। এখানেই না হয় খেয়ে ফেলি।

– মা, হাসপাতালে বাহিরের খাবার নিষেধ। একটু পর দুপুরের খাবার আসবে, সেইটাই খাব। তোমরা দাওয়াতে চলে যাও। আমার কিছু হবে না।

– কি যে বলিস তুই! তুই এই হাসপাতালের খাবার খাবি! মাথা খারাপ নাকি তোর! কি না কি খাবার খাওয়ায়, কোথায় রান্না করে, খাবারের মান কেমন তার কি কোন ঠিক ঠিকানা আছে! তোকে এইখানের খাবার খেতে হবে না। তোর বাবাকে বলছি কাচ্চি নিয়ে আসতে, সেটা খাবি। পা ভেঙ্গে বিচানায় পড়ে আছিস আর বলিস বাহিরের খাবার খাবি না।

– আহা, বাবাকে শুধুশুধু কষ্ট না দিয় না তো। আর শুধু শুধু হাসপাতালের নিয়ম ভাঙ্গা ঠিক হবে না।

– ঠিক আছে, তোর কথাই মানলাম। কিন্তু সারাদিন তো মনে হয় কিছু খাসনি। কি খাবি এখন সেইটাই বল।

– আমার এখন খেজুরের লালি দিয়ে জাও-ভাত খেতে ইচ্ছে করছে। তুমি পারলে সেইটার ব্যবস্থা কর। তবে খেজুরের লালি যদি না পাও তাহলে চিনি হলেও চলবে।

– ঠিক আছে, তোর বাবাকে বলছি এর ব্যবস্থা করতে।

দুই

মতিন মিয়া সচরাচর সিগারেট খায় না। কেবল মাত্র বিশেষ বিশেষ দিনে খায়। আজকে তেমনি একটা বিশেষ দিন। অনেক দিন পর হাতে কাজ পেয়েছে সে। ইদানিং আগাছার মত কিছু আনাড়ি লোক সস্তায় কাজ করে দেয়। যার ফলে আগের মত কাজ পাওয়া যায় না। কাজ পেলেও তার দাম এখন অনেক কম। আগে যেখানে মতিন মিয়া পঞ্চাশ হাজারের নিচে কাজে হাত দিত না সেইখানে আজকে বিশেই রাজি হয়ে গেল। কি আর করবে, দিনকাল খারাপ যাচ্ছে। লোকে আর প্রফেশনালদের ধার ধারে না। চার-পাঁচ হাজার খরচ করে ছিচকে লোকজনদের দিয়েই কাজ করায়। এমন চলতে থাকলে এই লাইনে আর থাকা যাবে না। নতুন রাস্তা খুঁজতে হবে।

সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে ছাড়তে ছাড়তে মতিন মিয়া তার দোকান বন্ধ করার প্রস্তুত নিচ্ছে। কারওয়ান বাজারের কাছে রেল সড়কের পাশে এক ছোট্ট টঙ্গের দোকানে চা বেঁচে সে। চা-পান-সিগারেট বিক্রি করে তার আর রোজগার মোটামুটি ভালই হয়। তবে মতিন মিয়ার আসল ব্যবসা চা বিক্রি নয়। তার আসল ব্যবসা গলা নামানো। পথের ভিখারি থেকে শুরু করে বড় বড় এমপির গলা নামানোর রেকর্ড মতিন মিয়ার আছে। এত কিছুর পড়ও মতিন মিয়ার আসল পরিচয় খুব কমই লোক জানে। সেই জন্য অন্ধকার জগতে তার নাম মিচকা মইত্তা। অলিতে গলিতে সন্ধার পর মিচকা মইত্তার ভয়ে কেউ একা বাহির হয় না। কিন্তু লোকজন ঠিকই মতিন মিয়ার দোকানে বসে মিচকা মইত্তার কর্ম-কান্ডের কথা রসিয়ে রসিয়ে বলে। মতিন মিয়া এসব দেখে আর মনে মনে হাসে।


– কি খবর মতি ভাই? দোকান বন্ধ করলা নাকি।

– হ, শফিক ভাই। আজকাল ব্যবসাপাতি ভালা যাইতাছে না।

– তা ভাল যাবে কি করে! তোমাকে তো ইদানিং ৫ টার পর দোকানেই দেখা যায় না। ব্যবসাপাতি যা হবার তা তো ছয়টার পরে হয়। লোকজন কাজকর্ম সেরে তোমার কাছে একটু গল্প করতে আসে। সাথে কিছু চা-সিগেরেট খায়।

– তা ঠিক, তবে বড় মাইয়াডার অবস্থা ভালা না। সবাই কইতেছে জিনে আছর করছে।

– ডাক্টার দেখাইছ ?

– ধুরু মিয়া, জিনের আছরে কি আবার ডাক্তারের কিছু করতে পারব নাকি? সিরাজ মিয়া কবিরাজরে দেখাইছিলাম। নামকরা কবিরাজ। মেলা গুণী মানুষ।

– কাজ হইছে?

– নারে ভাই। কি যে হইল! সিরাজ মিয়ার মত কবিরাজ জিন ছাড়াইতে পারল না। বিশ্বাসই অয় না। মনটা বড়ই অস্থির অস্থির লাগে ভাই। চিন্তায় চিন্তায় কুল কিনারা পাইতেছিনা।

– তা গ্রামে না গিয়ে এইখানে কি কর ?

– আর বইল না ভাই, কয়দিন ধইরা মগবাজারে যাইতেছি জিঞ্জিরা বাবার আস্তানায়। জিঞ্জিরা বাবা বড় ভয়ংকর জিনিস। সে এক অদৃশ্য জিঞ্জিরার মালিক। সেইখানে তার একটা জেলখানা আছে। তার পোষা ৫২ টা জিন সেই জেলখানা তদারকি করে। শয়তান জিনদের সেই জেলখানায় জিঞ্জিরা বাবা আটকে রাখে।

– কোন কাজ হইছে কি ?

– না ভাই। দুই মাস ধইরা খালি এই তদবির ওই তদবির পালন করলাম। কিচ্ছু কাজ হইল না। মেলা টেকা পয়সা গেছে এর মধ্যে। কোন উন্নতি দেখতেছি না।

– এইসব ছাড়। আমি একজনের নাম ঠিকানা দিচ্ছি। তার কাছে যাও। আর খবরদার, তাকে টাকা পয়সা সাধবা না। সে একজন শিক্ষক মানুষ। অনেক জ্ঞানী লোক। মানুষজনের উপকার করে শান্তি পায়।

– কি যে বলেন ভাই। জিঞ্জিরা বাবার মত মানুষই পারল না। আবার একজন মাস্টর কেমনে কি করব?

– তোমার জিঞ্জিরা বাবার পেছনে তো দুই মাস সময় দিলা। এখন আমি যা বলি তাই কর। তার কাছে যাও। আল্লাহ চাইলে সে হয়ত এক সাপ্তাহেই সব ঠিক করে দিতে পারে।

– ঠিক আছে। দেন ঠিকানা। দেখি কোন ফল পাই নাকি। মেয়ের যেই অবস্থা, এখন জিঞ্জিরা বাবারও কোন ভরসা পাচ্ছি না।

– কাগজ কলম দাও, ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। তুমি গিয়ে স্যারের সাথে দেখা না করে আসবা না। সবকিছু স্যারকে বলবা। কিছুই বাদ রাখবা না।

– ঠিক আছে ভাই। যা বলেন আপনি।

তিন

হাসপাতালে এখন হুলস্থুল অবস্থা। বাদলের বাবা পাশের কোন এক হোটেল থেকে এক হাড়ি কাচ্চি নিয়ে এসেছে। এক হাড়ি বলতে ঐ হোটেলের সব কাচ্চি হাড়ি সহ নিয়ে এসেছে। হাসপাতালের সবাইকে সে কাচ্চি খাওয়াবে। এই নিয়ে এখন হাসপাতালে তিনটি দল হয়ে গেছে। একদলের মতে দেশে এত অনিয়ম চলছে এর মাঝে একদিন একটা অনিয়ম করলে কিছু হবে না। একদলের কথা হাসপাতালে বাহিরের খাবার নিষেধ, তাই সব ফেরত নিতে হবে। আরেকদলের কথা রোগীদের না খেলেও হবে, ডাক্তার এবং স্টাফরা খেতে পারবে।

মিসির আলি হাসপাতাল থেকে তার জিনিসপত্র বুঝে নিচ্ছিল এমন সময় এই কাচ্চির আগমন ঘটে। হাসপাতালের একজন স্টাফ তাকে কোনরকমে সব বুঝিয়ে দিয়েই চলে গেল। এই স্টাফ এখন তিন নম্বর দলে, যাদের মতবাদ রোগীদের কিছু খাবার দরকার নেই কিন্তু বাকিরা খেতে পারবে। হাতঘড়িটা দেখছে মিসির আলি। ঘড়ির উপরের কাঁচটা ভেঙ্গে গেছে তবে কাটা ঠিকই চলছে। মিসির আলি চাচ্ছিল আর দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতাল থেকে ছেড়ে বেড়িয়ে পরতে। কারন কাচ্চি নিয়ে যেই অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে যে কোন মুহুর্তে হাতাহাতি শুরু হয়ে যেতে পারে।

এদিকে হঠাত করে কিছু পুলিশ এসে ঢুকল এই ওয়ার্ড এ। এক জন নিজেকে ধানমন্ডি থানার সাব ইনিস্পেক্টর পরিচয় দিয়ে একটা ধমক দিতেই সবাই চুপ হয়ে গেল।

– কি? কি হচ্ছে এইখানে? এতবড় হাড়ি কিসের? কে এনেছে এই ঝামেলা।

– স্যার, ঐ ভুড়িওয়ালা লোকটা। এমনিতেই হাসপাতালে বাহিরের জিনিস আনা নিষেধ তার উপর এই লোকটা একেবারে হোটেল সুদ্ধ তুলে নিয়ে এসেছে।

– আপনি কে? আপনার পরিচয় কি?

– স্যার, আমি এইখানকার একজন ইন্টার্ন। এইযে পা ভাঙ্গা রোগীটা দেখছেন। আমি তার দায়িত্বে আছি। এই সব এই রোগীর বাবার কারনেই হয়েছে।

– আচ্ছা। ঠিক আছে আপনি যান। এইযে মহাশয়, একটু এইদিকে আসেন। (বাদলের বাবার দিকে তাকিয়ে)

– জি? কিছু বলবেন?

– আপনি কি এই কাচ্চির হাড়ি নিয়ে এসেছেন?

– জি, আমিই এনেছি। ছেলের এই অবস্থা দেখে আর থাকতে পারলাম না। ভাবলাম শুধু ছেলের জন্য নিলে আশেপাশের অন্য রোগীরা হয়ত মন খারাপ করতে পারে। তাই আমি সবার জন্যই নিয়ে এসেছি। চাইলে আপনিও খেতে পারেন।

– আপনি জানেন না যে হাসপাতালের রোগীদের বাহিরের খাবার খাওয়ানো নিষেধ?

– তা তো জানি, কিন্তু একদিন আইন উলঙ্ঘন করলে কিছু হয় না। আপনারাও তো কত আইন উলঙ্ঘন করেন।

– কি? আমরা আইন উলঙ্ঘন করি? আপনি নিজে আইন ভেঙ্গে আবার নিজের সাফাই গাইছেন এই বলে যে আমরা আইন উলঙ্ঘন করি। হাবিলদার, ইনাকে হাতকড়া পরাও। কত বড় সাহস, আইন ভেঙ্গে আবার আমাকে আইন শিখাতে আসে। এই কাচ্চির হাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হল। সাথে এই হাসপাতালের আইন ভঙ্গনকারীকে গ্রেফতার করা হল।

– কিন্তু, সামান্য এই কাচ্চির জন্য আপনি আমাকে গ্রেফতার করবেন? আমি মানুষের একটু উপকার করতে গেলাম আর আপনারা আমাকেই অপরাধী বানিয়ে ফেললেন? আজব তো!

– আপনি যা বলার থানায় গিয়ে বলবেন। হাবিলদার, ইনাকে এরেস্ট করে ইনাকে আর কাচ্চির হাড়ি থানায় নিয়ে আস। আর আপনারা সবাই যার যার কাজ করেন। হাসপাতালের মধ্যে এইসব চলবে না।

বাদলের বাবাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাবার পর একজন ডাক্তার মিসির আলির কাছে আসলেন। কিছু ঔষধ আর প্রেসক্রিপশন বুঝিয়ে দিয়ে মিসির আলিকে বাসায় চলে যেতে বললেন। মিসির আলির সকল খরচ বাদলই দিয়ে দিয়েছে। মিসির আলিকে তাই খুব একটা ঝামেলায় পড়তে হয়নি। হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে একটা রিক্সা নিয়ে জিগাতলায় তার বাসায় রওনা দিল মিসির আলি।

চার

মতিন মিয়া একটা বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিকানা অনুসারে এইটাই মিসির আলির বাসা হবার কথা। বিশাল এক বিল্ডিং। কমপক্ষে বিশ-তালা তো হবেই। নিজের পোশাক আশাক খুব একটা ভাল না দেখে মতিন মিয়া সংকোচ বোধ করছিল যে ভেতরে যাওয়া ঠিক হবে নাকি। একটু এগিয়ে এসে দরজা দিয়ে উঁকি দিল মতিন মিয়া। দেখল দারোয়ান বসে বসে আঁখ চিবুচ্ছে, আর রসটা খেয়ে নিয়ে উচ্ছিষ্ট অংশ একটা পত্রিকার উপর ফেলছে।

– ভাই, একটু শুনবেন?

– কি চাই?
[আঁখ খেতে খেতেই জবাব দিল দারোয়ান। ]

– আমি মিসির আলি নামের একজন লোকের লগে দেহা করতে আসছি। উনি কি বাসায় আছেন?

– না, স্যার বাসায় নাই। তবে দরজায় তালা দেওয়া নাই। কাছাকাছি কোথাও আছে মনে হয়। আপনি চাইলে তার ঘরে বসতে পারেন। অথবা অন্য কাজ থাকলে তা শেষ করে আবার আসতে পারেন।

– বড্ড বিপদে পইড়া আসলাম-রে ভাই। আপনি যদি একটু নিয়া যাইতেন উনার ঘরে। তাইলে বড় উপকার পাইতাম।

– আচ্ছা চলেন। এমনিতে কেউ এই অসুস্থ মানুষটার খোঁজ-খবর নিতে আসে না। কেবল বিপদে পড়লেই স্যারের কাছে সবাই আসে। তা, নাম কি আপনার ? কাজকর্ম কি করেন ?

– আমি মতিন মিয়া। কারওয়ান বাজারের দিকে একটা চায়ের দোকান আছে আমার। চা-পান বেইচ্চা সংসার চলাই।

– হুম, চায়ের ব্যবসা ভাল ব্যবসা। আমি চিন্তা ভাবনা করতেছিলাম এইখানেই একটা চায়ের দোকান দিয়া দিব। একই সাথে দারোয়ান এর চাকরি আর চায়ের ব্যবসা ভালই হইত। কিন্তু বাড়ির মালিক মনে হয় রাজি হবে না। পয়সা দেয় বাড়ি পাহারা দিবার জন্য। আর সেইখানে চায়ের দোকান দিয়া আড্ডাবাজি চালু করা কোনভাবেই মালিক মানবে না। আসেন, বসেন এইখানে। স্যার চইলা আসবে। কিছু লাগলে জানাইয়েন।

– ঠিক আছে ভাই। আমি এইখানে বইসাই অপেক্ষা করি।

দারোয়ান চলে যাবার পর মতিন মিয়া বাসার চারপাশটা মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগল। শুরুতে বিশাল বিল্ডিং দেখলেও মিসির আলি আসলে বিল্ডিং এ থাকেন না। বিল্ডিং এর পেছনে একটা টিনশেড বাসা আছে। দেখে মনে হচ্ছে তিন ঘর বিশিষ্ট টিনশেড বাসা। এর মধ্যে মিসির আলি একটা ঘরে থাকে। ঘরের সাথে অবশ্য একটা ছোট রান্নাঘরও আছে যাকে আসলে ঠিক রান্নাঘরও বলা যায় না। ছোট্ট একটা স্টোররোমকে রান্নাঘর বানানো হয়েছে। জিনিসপত্র বলতে আছে একটা কেরোসিনের চুলা আর কিছু একটা স্টিলের মগ, একটা চায়ের পাতিল, আর একটা কলস। তার মানে এই রান্নাঘর আসলে মূল রান্নাঘর না। মূল রান্নাঘর হচ্ছে একটা কমন রান্নাঘর যেইখানে সবাই রান্না করে। পাশের দুইটা ঘরের একটা খালি আর একটাতে কিছু জিনিসপত্র আছে। সম্ভবত দারোয়ান ঐ ঘরে থাকে।

মিসির আলির থাকার ঘরের ভেতর আসবাবপত্র বলতে একটা খাট, একটা কাঠের বই রাখার আলমারি, দুইটা চেয়ার (এর মধ্যে একটা চেয়ার ভাঙ্গা), আর একটা টেবিল ফ্যান। মিসির আলির এই ঘরটাকে দেখে মতিন মিয়ার নীলক্ষেতের পুরাতন লাইব্রেরীর কথা মনে পড়ছে। আলমারিতে আর বই রাখার জায়গা নেই বিধায় আশেপাশে মেঝেতে, খাটের উপর এক কোনায়, টেবিলের উপর, খাটের নিচে সহ প্রায় সবটা ঘরই বই-পুস্তকে ভর্তি। বেশিরভাগই ইংরেজি বই। মতিন মিয়া খোঁজে খোঁজে একটা বাংলা বই বের করল। বইটার নাম দেয়াল। একটা বইয়ের নাম শুধুমাত্র দেয়াল কেন হবে সেই কৌতুহলে মতিন মিয়া বইটা হাতে নিল।

দেয়াল নামক বইটা হাতে নিয়ে মতিন মিয়া গভীর মনোযোগ সহকারে বই এর প্রচ্ছদ দেখতে লাগল। বই এর উপর দেয়ালের কোন ছবি নেই। মলাটে শুধু দেয়াল নামটা রক্তিম বর্ণে লেখা আছে এবং তিনটা মোটা লাল দাগ রয়েছে বইয়ে। মাঝে মাঝে মানুষ একটা ঘোরের মধ্যে আটকে যায়। মতিন মিয়া এখন ঐরকম একটা ঘোরের মধ্যে আছে। তার মনে কিছু প্রশ্ন জাগ্রত হয়েছে।

প্রশ্ন ১ঃ কোন বইয়ের নাম শুধু মাত্র দেয়াল কিভাবে হবে? বইয়ের নাম দেয়ালের মধ্যে, কিংবা দেয়ালের উপর কিংবা দেয়ালের ওপাশে হতে পারত!

প্রশ্ন ২ঃ ধরলাম বইয়টা একটা দেয়াল নিয়ে লেখা, সেই কারনে বইয়ের নাম দেয়াল। তাহলে সেই বইয়ে অবশ্যই একটা দেয়ালের ছবি থাকা উচিত। কিন্তু এইখানে কোন দেয়ালের ছবি নেই।

প্রশ্ন ৩ঃ ধরি বইটা একটা দেয়াল নিয়ে লেখা, আর সেইখানে একটা দেয়ালও ছিল। কিন্তু কিছু লোক মারামারি করে হয়ত সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলে। তাই বইয়ের উপর কোন দেয়ালের ছবি নেই। হয়ত সেইখানে মারামারি-কাটাকাটি হয়েছে। তাই রক্তারক্তি কান্ড বুঝাবার জন্য রক্তিম অক্ষরে দেয়াল শব্দটা লেখা হয়েছে। আর সাথে কিছু লাল দাগের মানে হচ্ছে সেই রক্ত। তাহলে একটা অস্ত্রও ছবিতে দেওয়া উচিত ছিল। অস্ত্র ছাড়া রক্তারক্তি কিভাবে সম্ভব?

সমাধানঃ সবদিক বিবেচনা করে মতিন মিয়া এই সিদ্ধান্তে আসল যে কোন একটা জমির মাঝে একটা দেয়াল ছিল। দেয়ালের দুই পাশের জমির দুই পক্ষে জমি নিয়ে অনেক ঝগড়া। দুই পক্ষেরই ধারনা তাদের জমির পরিমাণ কম হয়ে গেছে এবং কিভাবে তাদের জমির পরিমাণ বাড়ানো যায় সেই নিয়ে তাদের অনেক পরিকল্পনা। হঠাত একদিন সেই দেই পক্ষের মাঝে শুরু হয় তুমুল ঝগড়া আর মারামারি। মারামারির এক পর্যায়ে কেউ কেউ খুন হয়। সম্ভবত তিনজন খুন হয়, তাই তিনটা দাগ। তারপর মারামারি শেষে পুলিশ আসে। এসে সবাইকে থানায় নিয়ে যায়। তাদের সবার বিচার হয়। বিচার শেষে পুলিশ এসে সেই দেয়াল ভেঙ্গে দেয় এবং সেইটা বাজেয়াপ্ত করে সরকারী খাস জমি করে নেয়। যেহেতু দেয়ালের আর কোন চিহ্নই অবশিষ্ট ছিল না তাই দেয়ালের ছবিও দেওয়া হয় নাই। ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেয়ালকেও তাই রক্তিম বর্ণে দেয়াল দিখা হয়েছে।

মতিন মিয়া এইবার বইটা যেইখানে ছিল সেইখানেই রেখে দিল। এই বইয়ের মূল কাহিনী মতিন মিয়া এখন জানে। তাই তার আর এই বই পড়ার প্রয়োজন নেই। এখন নতুন একটা বই দেখতে হবে আবার। নতুন একটা বই নজরেও পড়ল মতিন মিয়ার। এইবারের বইটা একটা ইংরেজি বই। বইয়ের নাম “Silence Of The Lambs” মানে “ভেড়ার বাচ্চাদের নিরবতা”। মতিন মিয়া প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ালেখা করে। সেইখানে একটা ইংরেজি কবিতা ছিল। কবিতার নাম ছিল “Mary had a little lamb” যেখান থেকে মতিন মিয়া জানে Lamb মানে হচ্ছে ভেড়ার বাচ্চা। এখন এই বই নিয়ে মতিন মিয়ার কৌতূহল দেয়াল এর চাইতেও বেশি। কারন এইখানে কোন ভেড়ার ছবি নেই। ছবি আছে একটা প্রজাপতির মত পোকার যেখানে আবার ঐ পোকার মাথার উপর মানুষের খুলির ছবি।

অতঃপর “ভেড়ার বাচ্চাদের নিরবতা” নামের এই বই নিয়ে মতিন মিয়া আবারো একটা ঘোরের মধ্যে তার কল্পনা জগতে চলে গেল।

পাঁচ

বাসায় এসে মিসির আলি দেখল একটা লোক বই হাতে তার ঘড়ে পাইচারি করছে। বিড়বিড় করে কিছু বলছে আবার চুপ হয়ে চিন্তা করছে। মিসির আলি খেয়াল করল যে লোকটা ধবধবে সাদা ফুল-হাতা শার্টের সাথে লুঙ্গি পড়ে এসেছে। শার্টটা ইস্ত্রি করা, কিন্তু লুঙ্গিটা একেবারেই সাদামাটা পুরোনো ধরনের। ফুল-হাতা ঢিলেঢালা শার্টের মধ্যেও লোকটার বিশালাকার ভুঁড়ির অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। এইরকম বেখাপ্পা পোশাক দেখে মিসির আলি তেমন অবাক হয়নি। লোকটার কি পেশা হতে পারে তা নিয়ে মিসির আলি খানিকটা চিন্তা করল। লোকোটা লুঙ্গি পড়েই তার বাসায় চলে এসেছে এর দুইটা মানে হতে পারে, এক, লোকোটা বড় সড় ব্যবসায়ী যার টাকা-পয়সার হিসেব নিজের কাছে থাকে না। দুই, লোকটা সাধারণ দিনমজুর যার কাছে বিলাসী জীবন যাপন ধার ধারে না। মিসির আলির ধারনা লোকটা দ্বিতীয় ধাঁচের লোক, কারন ধনী ব্যবসায়ী হলে লোকটা অবশ্যই ইস্ত্রি করা শার্টের সাথে নতুন লুঙ্গি পড়ে আসত। এখন লোকোটার ভুঁড়ির কারনে একে শারীরিক পরিশ্রমী দিনমজুরের কাতারে ফেলা যাবে না। সে সম্ভবত কোন মুদি-দোকানদার হবে। দোকান এর ক্যাশে দিনের বেশীরভাগ সময় কাটাবার কারনে বসে থাকতে থাকতে তার ভুড়ির সাইজ বেড়ে গেছে। আর ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা শার্টের কারন হয়ত তার এই মুহুর্তে একমাত্র পরিষ্কার কাপড় এইটাই।

– আরে স্যার, আপনি কখন আসলেন! খেয়ালই করি নাই। আপনি নাই দেইখা টাইম-পাসের লেইগা আপনার বইপত্র দেখতেছিলাম।

– এইত, মাত্রই আসলাম। আপনার পরিচয়?

– আমি এমন কেউ না স্যার। আপনি ফেরেস হয়ে বসেন স্যার। আমি ঝটপট কইরা দুইকাপ চা বানাইয়া নিয়া আসি। স্যার কি চায়ে চিনি কম খান ?

– হ্যা, চিনি কমই খাই। না হলেও সমস্যা নেই।

– দুধ-চা খাবেন স্যার? আমার হাতের দুধ-চায়ের সবাই বিরাট প্রসংসা করে।

– বাসায় তো দুধ নেই। রং-চাই যথেষ্ট।

– সমস্যা নাই স্যার। আমার ব্যাগে আছে। আমি বানাইতেছি আপনার জন্য।

মিসির আলি ঘরে ঢুকে তার খাটে বসল। মাথাটা এখনো ঝিম-ঝিম করছে। একটু ঘুমুতে পারলে ভাল হত, কিন্ত বুঝা যাচ্ছে এখন সম্ভব না। লোকটা এখন চা বানাতে গেছে। ঘরে চা-পাতা সবসময়ই থাকে। কিন্তু চিনি আছে কিনা মিসির আলি নিশ্চিত না। ভাঙা চেয়ারটার উপর লোকটার একটা ব্যাগ রাখা। সম্ভবত সে আজকে ঢাকা ছেড়ে তার গ্রামের বাড়ি যাবে। লোকটা যদি টিপ-টপ পোশাক পড়া কেউ হত তাহলে মিসির আলি এই মুহুর্তে তাকে বিদায় করে পরবর্তি কোন সময় দেখা করতে বলত। কিন্তু এই লোকটাকে মিসির আলি কিছু বলতে পারছে না। মধ্যবিত্ত কিংবা তার নিচের শ্রেণির লোকদের প্রতি মিসির আলির একটা মায়া কাজ করে। এদেরকে মিসির আলি সহজে না বলতে পারে না।

– চা নিয়ে আসলাম স্যার। আপনার বাসায় একটা মাত্র মগ দেইখা আমি নিজেই একটা বানাইয়া ফেললাম, হা হা হা।

বাসার ছয়টা মগের মধ্যে ৫ টাই ভেঙ্গে গেছে। তার এক ছাত্রী বছরখানেক আগে তাকে এক সেট মগ গিফট করে যেখানে একই রকম দেখতে ছয়টা মগ ছিল। মিসির আলি দেখল যে লোকটা কোকের প্লাস্টিকের বোতল কেটে মগ বানিয়ে ফেলেছে। মিসির আলিকে আসল মগটা দিয়ে সে নিজের বানানো মগটা রেখেছে।

– বাহ, আপনার বুদ্ধিতো ভালই। তা, আমার বাসায় তো কোকের বোতল ছিল না। আপনি পেলেন কোথায়?

– এইটা স্যার আমার ব্যাগেই ছিল, আজকে রাতে তূর্ণা নিশিতা ট্রেনে কইরা বাড়ি যাব। যাবার আগে ভাবলাম আপনার সাথে দেখা কইরা যাই।

– তা আপনার কথা বলুন এইবার। মনে হচ্ছে জরুরী কাজেই এসেছেন আমার কাছে।

– একটা বিপদে পইড়া আসছিলাম স্যার। আমার এক কাস্টমার আপনার কথা বলছিল স্যার। প্রথমে তার কথা পাত্তা দেই নাই স্যার। আমার এই বিপদ কোন ডাক্তার সারাইতে পারব না। কিন্তু আমার কাস্টমার যখন বলছে আপনি একজন শিক্ষক মানুষ তখন ভাবলাম আপনার কাছে একবার চেষ্টা করতে দোষ নাই। আল্লাহ তালা কখন কার উছিলায় মুশকিল আছান করে তা কেউ জানে না।

– কোন ডাক্তার যদি আপনার সমস্যা সমাধান করতে না পারে তাহলে একজন শিক্ষক পারবে তা আপনি কি কারনে মনে করলেন? শিক্ষকদের কাজতো লেখা-পড়া করানো।

– স্যার, শিক্ষকরা অনেক কিছুই পারে। আমাদের প্রাইমারী ইস্কুলের হেড স্যারের পানি পড়া খাইলে একদিনেই পাতলা পায়খানা ভাল হয়ে যায়। উনি কচি ডাবের উপর দোয়া লেইখা দেন, তারপর তিন বেলায় তিনটা ডাব খাইতে বলেন। পরদিন সকালেই সব ঠিক ঠাক।

– আপনাদের হেড স্যার অনেক বুদ্ধিমান মানুষ। আসলে ডাবের পানিই এক ধরনের ঔষধ, যা ওরস্যালাইনের চাইতেও বেশী উপকারি। তা আপনার নামই জানা হয়নাই। আর ঢাকায় কি কাজ করেন আপনি।

– তওবা, তওবা স্যার। আমার নাম মতিন মিয়া। কারওয়ান বাজারের দিকে একটা চায়ের দোকান আছে আমার। চায়ের ব্যাবসা কইরাই সংসার চালাই। লোকজন কোনদিন আমার নাম জিজ্ঞেস করে না। চা খাইতে খাইতে গল্প করে, আবার খাওয়া শেষ হইলেই চইলা যায়। তাই স্যার আপ্নারে প্রথমে নাম বলার কথা মাথায় আসে নাই।

– বটে, তা আপনার বিপদের কথা বলুন এইবার। সন্ধ্যে হয়ে গেছে প্রায়। ট্রাফিক-জ্যামে রাস্তাঘাটের যা অবস্থা, কমলাপুর যেতেও দেড়-দুইঘন্টা লেগে যেতে পারে।

– সমস্যাটা আমার মেয়ের। একটা মাত্র মেয়ে স্যার। লেখাপড়াও শিখাইছি। অহন সে ডিগ্রি কলেজের ফাইনাল বছরে। স্কুলের মাস্টাররা অংকের জাহাজ বলত তারে। কিন্তু শেষ কালে মাথাটাই আওলাইয়া গেল স্যার। মেয়েটার উপর একটা শক্তিশালী জীনের বদ নজর লাগছে। কত কবিরাজ দেহাইলাম, কিছুই হইল না। জিঞ্জিরা বাবার কাছে তো লাখখানেক টেকা দেওয়া শেষ। কিন্তু জিঞ্জিরা বাবার ৫২টা জীনেও ওই এক জীনের সাথে পারে নাই।

– আপনি তাহলে আপনার মেয়ের কথা বলুন। মেয়ের নাম কি? বয়স কত? কি সমস্যা? কবে থেকে এই সমস্যা? এইসব কিছু। কোন কিছু বাদ দিবেন না। অতি তুচ্ছ মনে হলেও আপনার মত করে বলে যাবেন। আমি মাঝে মাঝে হয়ত আপনাকে থামাব কিন্তু আপনি আপাতত একটানা সবকিছু বলতে থাকুন।

ছয়

ধানমন্ডি থানায় এখন কাচ্চি খাবার উৎসব চলছে। হাসপাতালের নিয়ম ভেঙ্গে অবৈধভাবে এক হাড়ি কাচ্চি নিয়ে অনুপ্রবেশ করার কারনে গ্রেফতারকৃত আসামী বাদলের বাবাও থানায় বসে কাচ্চি খাচ্ছে। থানার সকল স্টাফ সহ হাজতে যারা আছে তাদের সবাই কাচ্চি খাচ্ছে। থানার সাব ইনিস্পেক্টর ইকরাম খান বাদলের বাবাকে হাজতে ঢুকায়নি। হালকা হুমকি-ধামকি দিয়ে ছেড়ে দেবার প্লান। যেই ব্যাক্তি এতবড় হাড়ি নিয়ে হাসপাতালে চলে আসে, তার মত পয়সাওয়ালা লোককে গরম মাথায় থানায় নিয়ে এলেও এখন খানিকটা টেনশনে আছে সে। যদি কোন রুই-কাতলা টাইপ লোক হয় তাহলে তার পোস্টিং বান্দরবান হয়ে যেতে পারে।

এইদিকে সবাই ফুর্তির সাথে কাচ্চি খেলেও ইকরাম খান খেতে পারছে না। কিছুক্ষন আগেই উপর থেকে ফোন এসেছে। এই কাচ্চি নিয়ে নয়, মিচকা মইত্তা নিয়ে। আগামী তিন দিনের মধ্যে মিচকা মইত্তাকে এরেস্ট করতে না পারলে তার পোস্টিং নতুন কোথাও হয়ে যাবে বলে হুমকি এসেছে উপরের মহল থেকে। বেশ কিছুদিন যাবত মিচকা মইত্তা নিয়ে টেনশনে দিন কাটাচ্ছে ইকরাম খান। দুই ঘন্টা পর পর উপরের লেভেল থেকে আপডেট চাওয়া হচ্ছে। বিশিষ্ঠ ব্যবসায়ী সুজন মিয়াঁর উপর হুমকি এসেছে মিচকা মইত্তার কাছ থেকে। সুজন মিয়া বিভিন্ন পণ্য আমদানি-রফতানির ব্যবসা করে তার মধ্যে পেঁয়াজ একটি। ইদানিং পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়াতেই নাকি মিচকা মইত্তা তাকে হুমকি দিয়েছে। মিচকা মইত্তার চাহিদা হচ্ছে “আগামী একসাপ্তাহের মধ্যে পেঁয়াজের দাম ২০ টাকায় আনতে হবে, অথবা তাকে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে। টাকা না দিলে পরবর্তী দুই সাপ্তাহের মধ্যেই লাশ পড়বে”। ব্যাপারটা উপরের মহলে অনেক সিরিয়াস ভাবেই নিচ্ছে। কারন এইবার কোরবানির ঈদের আগে বিশিষ্ঠ ট্যানারি ব্যবসায়ী হারুন ভাইকেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল যে এইবার চামড়ার দাম ১০০০ টাকার কম হলে তার লাশ পড়বে। কিন্তু এইবার গরুর চামড়া গড়ে ২০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। তার ঠিক ১ মাস পরই ধানমন্ডি লেকের পাশে হারুন ভাইয়ের লাশ পাওয়া যায়। লাশের বডির সাথে একটা মরা ছাগলের মাথা ছিল। আর লাশের মাথা ২০০ মিটার দূরে ঐ মরা ছাগলের বডির সাথে ছিল।

[চলবে … … …]

Tags
About The Author

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *