মনসুর

এক

বারান্দায় বসে আছে মনসুর। হাতে এক প্যাকেট বেনসন এন্ড হেজেস। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বেড় করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে সে। গত দুই সাপ্তাহ ধরে এই একই কাজটা করছে সে। কিন্তু একবারও সিগারেটে আগুন ধরায়নি। কারন মনসুর সিগারেট খায় না। আজ পহেলা বৈশাখ। মনসুরের ইচ্ছা আজ থেকেই সিগারেটটা শুরু করবে। বিশেষ কাজ করার জন্য বিশেষ দিন থাকা ভাল। তাহলে দিন-ক্ষন সবই মনে থাকে।

গত ছয়মাস ধরে মনসুরের জীবনে শুধু হতাশাই হতাশা। ছয় মাস পুর্বেমনসুর ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে। গ্রাজুয়েশনের পর থেকে এখন পর্যন্ত সে অনেক কম্পানিতে চাকুরির জন্য আবেদন করে। কিন্তু তাকে ইন্টারভিউ এর জন্য কেউ ডাকেও নি। সম্ভবত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কম সিজিপিএ এর প্রধান কারন। অথচ মনসুরের দক্ষতার অভাব নেই। তার বেশ কয়েকটা ভাল মানের লাইভ প্রোজেক্টও আছে। এর মধ্যে একটি প্রজেক্ট হল “ভাষান্তর”। এটি তার গ্রাজুয়েশনের জন্য ফাইনাল প্রোজেক্ট ছিল। মনসুরের ধারনা ছিল এই প্রোজক্টের জন্য সবাই তার খুব প্রসংসা করবে। কিন্তু সবাই তাকে তামাশার পাত্র বানিয়ে ফেলল। এমনকি কয়েকজন শিক্ষকও তাকে বলল যে – কেউ তার ফাইনাল প্রজেক্টের জন্য একটা Dictionary বানিয়ে আনবে সেইটা তারা ভাবতেও পারেনি। সেই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই তাকে ডিকশেনারি মনসুর নামে ডাকা শুরু করে। অথচ মনসুর কাউকে বোঝাতেই পারেনি যে এটি একটি স্বাধারন অনুবাদক না। এর মধ্যে তার দুই বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি করা একটি এলগরিদম আছে। এলগরিদমটি অতি সহযেই কোন একটি ভাষা শিখতে পারে এবং নিজে নিজেই তার মধ্যে থাকা অন্য যে কোন ভাষায় অনুবাদ করতে পারে। মনসুরের ধারনা ছিল সে একটি ভাল মানের Artificial Intelligence তৈরি করেছে, কিন্তু কেউ তার কথা মানতে পারল না। সবার ধারনা মনসুর আগে থেকেই ডাটাবেজে সবকিছু রেখে শুধু অনুবাদ করছে আর সবাইকে বোকা বানাবার চেষ্টা করছে।
সিগারেটে আগুন ধরাতে গিয়ে মনসুরের মনে হল তার নিকট দিয়াশলাই নাই। সে দিয়াশলাই আনার জন্য রান্নাঘরের দিকে যখন পা বাড়াল ঠিক তখনই তার মোবাইলের রিং বেজে উঠল। টিএন্ডটি নম্বর থেকে ফোন। ফোনটা ধরল মনসুর।
– হ্যালো ।
[অপর পাশ থেকে ইংরেজিতে]
– হ্যালো, আপনি কি জনাব মন্সুর আলী বলছেন ?
– জি, আমিই মনসুর আলী।
– আপনি কি ঢাকার মধ্যেই আছেন ?
– জি, আমি এখন ঢাকাতেই আছি।
– আপনি কি আজ সন্ধ্যা সাতটায় ফ্রি আছেন ?
– জি, আমি ফ্রি আছি। কেন বলবেন প্লিজ ?
– আমি নাসা থেকে বলছি। আপনার সাথে আমাদের তিন সাপ্তাহ আগে কথা হয়েছিল। সেইখানে আমরা আপনার ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম।
[ মনসুর চিন্তায় পরে গেল। তিন সাপ্তাহ আগে কি সত্যিই নাসা থেকে ফোন করেছিল। নাকি অন্য কেউ দুষ্টামি করেছিল। ]
– হ্যালো, জনাব মন্সুর আলী । আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন ?
– জি, আমি শুনতে পাচ্ছি। আপনারা আমার সাথেই তিন সাপ্তাহ আগে কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমি বোঝতে পারিনি যে সেটি ইন্টারভিউ ছিল।
– আমরা আজকে আপনার সাথে একটু আলোচনা করতে চাচ্ছি আপনার ভাষান্তর প্রোজেক্ট নিয়ে। আপনি কি সন্ধ্যা সাতটায় গুলশান-২ এ সিক্স সিজন হোটেলে আসতে পারবেন।
– হ্যা, পারব।
– তাহলে আপনি আজ সন্ধ্যা সাততার মধ্যে সিক্স সিজন হোটেলে চলে আসেন। সেইখানে রিসিপসনে আপনার নাম এবং নাসায় এসেছেন বললেই হবে। আর, আপনার ব্যাংক একাউন্টে ৩০ মিনিটের মধ্যে ৫০ হাজার টাকা চলে আসবে। আপনার প্রয়োজনে হলে যে কোন খরচ করতে পারবেন সেখান থেকে।
– কিন্তু আমার একাউন্ট নাম্বার জানলেন কিভাবে ? এবং কেনই বা এত টাকা আমাকে দিবেন ?
– আপনার সম্পর্কে অনেক তথ্যই আমাদের কাছে আছে। এমন কিছু তথ্যও আছে যা সম্পর্কে আপনি হয়তো নিজেও জানেন না। আর ৫০ হাজার টাকা আপনার কাছে আপাতত অনেক মনে হলেও আমাদের নিকট তা অতি সামান্য। আপনি সাতটায় মিটিং-এ আসলেই বুঝবেন যে কেন আপনাকে এত টাকা দেওয়া হচ্ছে। আপাতত আপনি এতকিছু চিন্তা না করে চলে আসেন। আমরা আপনার অপেক্ষায় আছি।
– ঠিক আছে। আমি সময় মতই চলে আসব। ধন্যবাদ আপনাকে।
– আপনাকেও ধন্যবাদ আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং নাসায় আপনাকে স্বাগতম।
ফোনটা টেবিলের উপর রাখল মনসুর। বেনসন এন্ড হেজেস ধরা তার হাতটা এখন থর থর কাঁপছে। সত্যিই কি নাসা থেকে ফোন এসেছে ! তার সামান্য এই অনুবাদক প্রোজেক্টে কি এমন দেখল নাসা !

দুই

মোবাইলের মেসেজ দেখে চমকে উঠল মনসুর। তার ব্যাংক একাউন্টে ৫০,০০০/= টাকা জমা হয়েছে। তার মানে সত্যিই নাসা থেকে ফোন এসেছিল। নাকি এইটা অন্য কারো ষড়যন্ত্র। ভাবনায় পড়ল মনসুর, কেইবা তার সাথে ষড়যন্ত্র করবে। তেমন ভাল কোন বন্ধু না থাকলেও , কোন শত্রুও নাই।
ঘড়ির দিকে তাহাল মনসুর। বেলা দুইটা পাঁচ বাজে। দুপুরের খাবার এখনও খায়নি মনসুর। যদি ইন্টারভিউ দিতে যেতে হয় তাহলে হাতে খুব বেশি সময়ও নেই। তাড়াতাড়ি গোসল শেষ করে ১২ নম্বরের হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে চলে আসল মনসুর। এই হোটেলে সে মেস-মিল হিসেবে খায়। তাতে খরচ কম পড়ে।

খাবার শেষ করে বাসায় ফিরছে মনসুর। এমন সময় মোবাইলে রিং বেজে উঠল। আবারও কি নাসা থেকে ফোন আসল নাকি, মনে মনে ভাবল মনসুর। পকেট থেকে ফোন বেড় করে দেখল মনসুর। নাহ, নাসা নয়, তার পরিচিত নম্বর থেকেই ফোন এসেছে।
– হ্যালো বাপ্পি, কি খবর ? হঠাৎ কি মনে করে ?
– আমি তো ভাল দোস্ত। তবে একটু বিপদে পড়ে ফোন করেছি।
– কেন ? কি হয়েছে আবার ? কোন বড় ধরনের সমস্যা হয়নিত ?
– আমার কিছুই হয়নি। ঝামেলা বাঁধিয়েছে নীলা। সে সুইসাইড করার চেষ্টা করেছে। বা হাতের রগ বেশ ভালভাবেই কেটে ফেলেছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। এখন ঢাকা মেডিক্যালের ইমার্জেন্সিতে আছে।
“নীলার কথা শুনে আনমনা হয়ে গেল মনসুর। সুন্দরী, তবে বড় অহংকারী মেয়ে। শুরুর দিকে তার প্রতি বেশ দুর্বল ছিল মনসুর। প্রথম বর্ষের শেষ দিকে তাকে মনের কথা বলতে গিয়েছিল মনসুর। কাজের কাজতো কিছুই হয় নাই, বরং সেই জন্য তাকে এর খেসারতও দিতে হয়েছিল। প্রথমে আফজল গ্রুপ এর হাতে মার খেয়ে সাতদিন হাসপাতালে ছিল। তারপর, ভার্সিটিতে যাবার পর প্রায় বছরখানেক সবার কাছে টিটকারি শুনতে হয়েছিল। সেই কঠিন সময়গুলো আবারও মনে পড়ে গেল মনসুরের।”
– কিরে মনসুর ? কথা বলিস না কেন ?
– ও হ্যা। কি করতে হবে আমাকে ?
– তেমন কিছুই না, তোর তো “O-” গ্রুপের রক্ত। বিকেল পাঁচটার মধ্যে একটু রক্ত দিতে হবে।
– কিন্তু আমি তো তখন আসতে পারব না। সন্ধায় আমার একটা ইন্টারভিউ আছে। যাওয়াটা অনেক জরুরী। বেশ ভাল কোম্পানি।
– দেখ ভাই, আমি বুঝতে পারছি তুই কি কারনে আসতে চাচ্ছিস না। অতীতের কথা ভুলে যা। আর যেখানে কারো জীবন-মরনের প্রশ্ন সেইখানে আপাতত চাকরীর কথাটা পরে ভাব। চাকরী করার তো তুই অনেক সুযোগ পাবি। এখন একজন মানুষকে বাচাতে হবে সেইটাই আসল।
– কিন্তু আরও তো অনেকেই আছে O- গ্রুপের। ব্যবস্থা কিছু না কিছু হয়ে যাবে। পাঁচটা বাজতে এখনো দুইঘন্টা বাকি।
– তুই নিশ্চয় জানিস। “O-” তেমন একটা পাওয়া যায় না। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না বলেই তোকে বলছি আমি।
– বাংলাদেশে “AB-” পাওয়া খুব কঠিন। “O-” পাওয়া তার চাইতে অনেক সহজ। তাছাড়া আমার এখন আসাটাও অনেক কঠিন ব্যপার। কিছুক্ষন আগে মাত্র জানতে পারলাম সন্ধায় ইন্টারভিউ। এমনিতেই কোথাও চাকরী পাচ্ছি না। এইটা খুব ভাল একটা সুযোগ ছিল। তাই আসতে পারব নাকি চিন্তায় আছি।
– তুই চাকরি নিয়ে চিন্তা করিস! নীলার বাবার কতগুলা ফ্যাক্টরি আছে তা তো জানিসই। এর চাইতে বড় সুযোগ আর পাবি না। নীলার বাবা জানলে তোকে ভাল বেতনের চাকরীর ব্যাবস্থা করে দিবে।
– হা হা হা হা, তুই বোধহয় ভুলে গেছিস আমি ভিক্ষার জিনিস গ্রহন করি না। কাউকে রক্ত দিয়ে বিনিময়ে আমি কিছু নেই সেইটা অসম্ভব। কাজেই আমি রক্তও দিব না। আর ওই ভিক্ষার চাকরীও লাগবে না আমার। রাখলাম এখন, আল্লাহ হাফেজ।
ফোনটা কেটে দিল মনসুর। নীলার নাম শুনে তার মেজাজটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
এরই মধ্যে বাসায় চলে এসেছে মনসুর। ড্রয়ারের ভেতর থেকে পোশাক বাহির করল। এইগুলা দিয়েই ইন্টারভিউ দিতে হবে। কিন্তু হায়, একি অবস্থা। এত যত্ন করে রাখা সাদা শার্টের মধ্যে তেলাপোকা ডিম পেড়ে অবস্থা খারাপ করে রেখেছে। এইটা পড়ে তো আর ইন্টারভিউ দেওয়া যাবে না। প্যান্টের অবস্থা স্বাভাবিকই আছে, কোন সমস্যা দেখা যাচ্ছে না।
টেবিলের নিচ থেকে পলিতে মোড়া কালো সু-জোড়া বাহির করল মনসুর। ঠিকই আছে সু-জোড়া। গতবছর ফার্মগেট থেকে সারে চারশ টাকায় কেনা হয়েছিল এইগুলা। বছরে ২/৩ দিনের বেশি পড়া হয়না বলে খুব দামি সু কিনতে চায়নি সে।
ব্যাংকে তো এখন ভালই টাকা-পয়সা আছে, ভাবল মনসুর। গুলশান থেকে একটা শার্ট কিনে নিলেই হবে। নতুন জুতাও কেনা যায়। পুরনো ওই সু পড়ে টাইলসে হাটতে গেলে খট খট শব্দ করে। সেই সাথে প্যান্টও কিনে ফেলা যায়। হাতে ভালই সময় আছে।
এটিএম কার্ডটা সাথে নিয়ে ঘড় থেকে বাহির হল মনসুর। আজকের দিনটা মনে হয় খারাপ যাবে না। ৫০ হাজারের সবটাই তো সে খরচ করবে না। হাজার দু-এক এর মধ্যেই সব ম্যানেজ করে ফেলবে মনসুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *